শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০১৬

অন্যরকম ভালোবাসা (শুভ পুস্পিতার প্রেম অধ্যায়)

- দুঃখিত,এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া...

ধুর, মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল পুস্পিতার... একে তো রাত বাজে ১২ টা, এখনও আসছে না, তার উপর গাধাটা ফোন বন্ধ করে রেখেছে। আসুক, আজকে শুভ'র  একদিন কি আমার একদিন... বারান্দায় বসে শুভকে শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান করছে পুস্পিতা । বাসায় আর কেউ নেই । কাজের মেয়েটা গতমাসে বাড়িতে গেছে, এখনও আসে নাই, আর মনে হয় আসবে না। ওরা দুইজনই চাকরি করে, তার উপর পুস্পিতা রান্না বান্না তেমন একটা পারে না । তারপরেও কোনমতে কাজ চালাচ্ছে, শুভ  অনেক হেল্প করে কাজে। আজ ওর অফিস ছিল না, তাই ভাবল আজ শুভ'র  জন্য ভাল কিছু রান্না করবে। মাকে ফোন দিয়ে রেসিপি নিয়ে শুভ'র  পছন্দের অনেক কিছুই রান্না করেছে... আর আজই ওনার আসার কোন খবর নাই,কি এমন কাজ পড়ে গেল... ফোনটাও বন্ধ। মেজাজটাই খারাপ লাগছে... কলিংবেল বাজল... শুভ ঘরে ঢুকতেই পুস্পিতা ঝাড়তে শুরু করল,

-এত দেরি কেন আজ? আর ফোনই বা বন্ধ কেন শুনি?

- ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল,সরি...

-একবার জানাতে তো পারতে, কতক্ষন ধরে অপেক্ষা করছি।

বিরক্ত স্বরে শুভ বলল,
-আরে বাবা বললাম তো চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল,তাই জানাতে পারি নাই... এত প্যাঁচাও কেন তুমি? ক্ষুধা লেগেছে, খাবার দাও।

আহত চোখে শুভ'র  দিকে তাকাল পুস্পিতা । বলল,
' টেবিলে খাবার দিচ্ছি, ফ্রেশ হয়ে এসো।'

খেতে এসে চুপচাপ খাওয়া শুরু করল শুভ। একটা কথাও বলল না, একবারও বলল না যে এতকিছু তুমি কিভাবে রান্না করেছ? পুস্পিতার কান্না পাচ্ছে। শুভ কি একবারও বলতে পারত না যে ' তুমি খেয়েছ'? ওর হয়ত পুস্পিতার কথা মাথাতেই নেই। শুভটা  এরকমই... পুস্পিতা খুব ভাল করেই শুভকে  চেনে, তারপরেও প্রতিবার কষ্ট পায়। পুস্পিতা আর না পেরে বলেই ফেলল,

-তুমি এমন কেন? আমি কত কষ্ট করে তোমার জন্য এত কিছু রান্না করলাম, একসাথে খাব বলে কতক্ষন ধরে অপেক্ষা করছি, আর তুমি আমাকে একবারও বললে না খেতে।

শুনে থতমত খেয়ে গেল শুভ...
-সরি সরি... প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছিল তো... আমি যে কি না? কেন যে বার বার এরকম করি... i m sorry...প্লিজ কষ্ট পেও না,প্লিজ।

শুভটা এরকমই। পুস্পিতা ঠিক শুভকে  বুঝতে পারে না... ও যে ইচ্ছা করে পুস্পিতাকে কে কষ্ট দেয় তা না... ও ব্যপারগুলা বোঝেই না, পুস্পিতা জানে। ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ৩ বছর হল, এর আগে প্রায় ৪ বছর প্রেম করেছে ওরা। প্রেম বিষয়টা আসলে শুভ'র  সাথে যায় না। পুরাই রোবট টাইপ একটা মানুষ, কেন যে ওর মত একটা ছেলের প্রেমে পড়ল পুস্পিতা ভেবেই পায় না। সবসময় পুস্পিতার একটাই অভিযোগ ছিল যে শুভ একটুও romantic না। ওর বান্ধবীর boyfriend রা ওদের জানপাখি  প্রানপাখি কতকিছু ডাকতো ,কতকিছু করত, আর শুভ এসবের ধারকাছ দিয়েও যেত না। পুস্পিতা জানে শুভ ওকে ভালবাসে, কিন্তু ওর সবকিছুতে এত নির্বিকার ভাব ভাল লাগে না। বিয়ের আগে পুস্পিতা  খুবই confused ছিল যে শুভ আসলেই ওকে ভালবাসে কি না। তারপরেও risk নিয়েছে এবং অনেক ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে বিয়েটা করেই ফেলেছে। ভুল করে নি পুস্পিতা , এটা ও জানে। ও জানে শুভও  ওকে ওর মতই ভালবাসে...ভালই আছে ওরা, তারপরেও এসব ছোটখাটো ব্যপার মাঝে মাঝেই ওকে কষ্ট দেয়।

খেতে খেতে পুস্পিতা শুভকে  বলল,
-আজ মা ফোন দিয়েছিল

-কি বলল আম্মু? আমাকে তো ফোন দেয় না, ছেলের চেয়ে বউএর দরদ বেশি দেখা যায়। আমার আম্মু টা তোমার মধ্যে কি যে পাইছে আল্লাহই জানেন।' বলেই মুচকি হাসল শুভ... এই ব্যপারটা ওর খুবই ভাল লাগে। মেয়েটার মধ্যে কি যেন আছে, সবাইকেই আপন করে নেয়।

-ফাইজলামি বাদ দাও, মা বলল নাতির মুখ দেখতে চায়... অনেকদিনই মা আকার ইঙ্গিতে বলেছে,আজ সরাসরিই বলল। আমারও এরকমই ইচ্ছা,তুমি কি বল?

-আজব!! তোমাকে বলেছি না এখনি না... কেন কয়দিন পর পর এই টপিক তোল?- রাগান্বিত স্বরে শুভ বলল।

-এখন না তো কখন? ৩ বছর তো হয়ে গেছে... আমাদের না প্ল্যান ছিল ২ বছর পরেই একটা বাবু হবে আমাদের?

-ওসব বিয়ের আগের কথা এখন কেন তুলতেছ?

-মানে কি? বিয়ের আগের কথা কি এমনি ছিল? কত না প্ল্যান ছিল আমাদের,বাবুর সবকাজ তুমি করবা,আমি শুধু বসে বসে দেখব। বাবুর নাম হবে আয়াত।  এখন এরকম কেন কর তুমি?' চোখে পানি টলমল করছে পুস্পিতার

- আমাকে আরও কিছুদিন সময় দাও। আরেকটু গুছিয়ে নেই। আর আম্মুকে আমি বুঝিয়ে বলব। ব্যপারটা আপাতত বাদ দাও।

- আর কতদিন বাদ দিব? কিছু বললেই তুমি avoid করে যাও......আজকে তোমার প্রব্লেমটা ক্লিয়ার কর আমাকে।

-ধুর, এর জন্যই তোমার সাথে কথা বলতে চাই না। কথা তো কিছু বুঝবা না, অযথা তর্ক করবা...

- কোনটা অযথা তর্কশুনি? বিয়ের আগে একরকম কথা, বিয়ের পরে আরেকরকম কেন? আর অযথা অজুহাত দিবা না, আমাদের অবস্থা যথেষ্টই ভাল... আর গুছিয়ে নেয়ার কিছু নাই।

-তোমার সাথে কথা বলারই কোন মানে হয় না।- বলে বেডরুমে চলে গেল শুভ, ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিল। পুস্পিতা  বারান্দায় একা বসে আছে... এই একটা ব্যপার কোনভাবেই মিলাতে পারে না ও। আর সবকিছু ঠিক আছে, কিন্তু বাচ্চা নিতে চায় না শুভ। বললেই রাগারাগি করে, অথচ ওরই এই ব্যাপারে আগ্রহ বেশি ছিল। কাঁদছে পুস্পিতা ...
মাঝে মাঝে রাগও লাগছে। কেন এরকম করবে শুভ? অযথা কেন রাগারাগি করবে? আগে সবসময় শুভকে  বলত পুস্পিতা ' এমন কি করেছ তুমি আমার জন্য যাতে আমার মনে হয় যে তুমি আমাকে ভালবাস?' আজ আবার এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে শুভকে ।

সকালে শুভ এসে পুস্পিতাকে বলল,
- আমি সরি পুস্পো, কাল একটু বেশি করে ফেলেছি... সরি,মন খারাপ করো না,প্লিজ।

পুস্পিতা কোন কথা বলল না। রাগে ওর গা কিটকিট করছে। নাস্তা করে অফিসে চলে গেল,ফোনটা বন্ধ করে দিল। পুস্পিতা অফিস থেকে ইচ্ছা করে দেরি করে ফিরল,এসে দেখে শুভ শুয়ে আছে। ও আর কোন কথা না বলে খেয়ে শুয়ে পড়ল। শুভ'র  সাথে কোন কথাই বলল না।

পরদিন সকালে উঠে ফোন অন করতেই দেখে ওর।এক বড় আপু ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ওর cousine,ডাক্তার। তিথি কল ব্যাক করল। আপু ফোন ধরেই বলল,

-কি সমস্যা তোর? তুই এখনও শুভকে  বলিস নাই যে ওইটা fun ছিল?

- মানে কি!!!!তুমি কিসের কথা বলছ?

-তোর প্রেগন্যান্সির কথাটা...

-কি বল তুমি? তুমি সেদিন শুভকে  কি বলেছিলা??

-আমি ওকে বলেছিলাম যে তোর একটা প্রব্লেম আছে, তুই।কখনও প্রেগন্যান্ট হতে পারবিনা। হলেও তোর এবং তোর বাচ্চা দুইজনেরই মারা যাওয়ার possibility বেশি । আমি তো ভেবেছিলাম তুই ওকে তখনই বলে দিয়েছিস। কাল শুভ আমাকে ফোন দিয়ে বলে যে এর কি কোনই treatment নেই? যত টাকা লাগে খরচ করবে আমিতো অবাক...শুভকে  কিছু বলি নাই,তারপর থেকেই তোকে ফোন দিচ্ছি।

ফোন রেখে পুস্পিতা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে... বিয়ের.২ বছর আগের কথা। শুভ'র  কোন কাজেই ওর মনে হত না যে শুভ ওকে ভালবাসে।শুভ ওকে আসলেই ভালবাসে কি না এটা টেস্ট করার জন্য পুস্পিতা ওর ডাক্তার cousine কে বলেছিল শুভকে এই কথাটা বলতে। তারপর সেদিনই শুভ'র  সাথে ওর কি নিয়ে যেন ঝগড়া লাগে,এরপর ৩ দিন কথা বলে নাই।এর মাঝে পুস্পিতা ভুলে গেছে এই ব্যপারটা। আপুকেও জিজ্ঞেস করতে মনে ছিল না। ওর মাথায় কিছুই ছিল না, আর শুভ এটাকে সত্য ভেবে 5 টা বছর ধরে কষ্ট পাচ্ছে!! ও কোনদিন মা হতে পারবে না জেনেও শুভ ওকে বিয়ে করেছে, এতদিনে একবারের জন্যও ওকে বুঝতে দেয় নাই... আর সেই শুভকে  ও ভুল বুঝেছে এতদিন!!! শুভ সবসময় বলত,'
-আমি হয়ত তোমাকে সুখি করতে পারি না, আর দশটা boyfriend বা husband এর মত romantic কথা বলতে পারি না, কিন্তু কোন একদিন তোমার জন্য এমন কিছু একটা করব যেটা সবাই করে না।' শুভ আজ সেটা করে দেখিয়েছে। মা হতে পারবে না জেনেও কয়টা ছেলে বিয়ে করে??এতটা ভালবাসে? পুস্পিতার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে, এই ছেলেটাকে সে এত কষ্ট দিয়েছে... পুস্পিতা রুমে গিয়ে দেখল শুভ অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে... দৌড়ে ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়ল পুস্পিতা ... সব খুলে বলল...

শুনে শুভ হাসতে হাসতে বলল,
-দিলা তো আমার শার্ট এর বারটা বাজিয়ে... এখন অফিসে যাব কিভাবে?? অফিসে আমার এত্তগুলা সুন্দর সুন্দর মেয়ে কলিগ... আমার একটা ইমেজ আছে না...
বলেই দিল দৌড়... এখন এই  মেয়ের আসেপাশে থাকাটা নিরাপদ না। হাতের কাছে একটা বালিশ ছিল তাই নিয়ে পুস্পিতা ছুটল ওর পিছনে,

- আজ তোমার অফিসে যাওয়া আমি বের করতেছি... দাড়াও...
ভাবটা এমন যে বালিশ দিয়েই শুভ'র  মাথাটা ফাটিয়ে দিবে আজ।
একজনের পিছনে আরেকজন সাড়া ঘর দৌড়াচ্ছে, দুইজনেরই চোখে পানি আর মুখে হাসি... প্রকৃতি খুবই অদ্ভুত!!!


__   আহমেদ শুভ৯৬৯
ahmed shuvo969


শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

বিজয়ের হাসি...............।।


প্রান যে আমার সুখ বিলায়ে মুখ যে হাসি হাসি,
 মন যে আমার বলছে বাংলা,
 তোমায় ভালোবাসি ।
 টেবিলের উপরে রাখা ডায়েরীর মতো প্যাডটাতে দুটো লাইন লিখলেন আতিকুর রাহমান । আতিকুর রহমান কোন ঘোষিত কবি না তবে  মাঝে মাঝেই কবিতাকয়েক পঙক্তি লিখেন, বেশ ভালোই লিখেনএখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাবেন শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে । যাবার আগে ভাষার তরে দুইটা লাইন লিখে গেলেন । প্রতিদিন ই বিভিন্ন বিষয়ে দু লাইন করে লিখে রাখেন এই প্যাডটাতে । আজ ও তাই ব্যতিক্রম হয়নি । তিনি আজ দফদফে সাদা এক পাঞ্জাবি পড়েছেন। পাঞ্জাবির মাঝে মাঝে লাল বর্ণের  আঁকা কিছু দাগের প্রতিচ্ছবি,  ভাষা শহীদের সাদা মনে যেমন টি রক্ত দাগ বসিয়েছিলেন হানাদাররা।
আতিকুর রহমানের জন্য আজকের দিনটা অন্য রকম । কারণ আজ ২১ এ ফেব্রুয়ারি, রিকশা নিয়ে তিনি শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন।
 দূর থেকে মাইকের আওয়াজে ভেসে আসছে গান
 ‘‘ আমি বাংলায় গান গাই
 আমি বাংলার গান গাই
 আমি আমার আমিকে চিরদিন
 এই বাংলায় খুঁজে পাই।
 মুখের হাসি আরেকটু চওড়া হল উনার । যাক্ আজ তাহলে অনেকের মনে আছে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারদের । আজ যেন ঘরের বাইরে ভেতরে সব জায়গায় এক অন্যরকম ব্যস্ততা বিরাজ করছে । বাইরের ব্যস্ততাকে নিয়েই ঘরের ব্যস্ততা । এই ব্যস্ততাতে যোগ দিয়েছে উনার ১১ বছরের মেয়ে নওরিনও । মেয়েকে বাংলাদেশের কালারের জামা পড়িয়ে দিয়েছেন উনার স্ত্রী । তাকে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাচ্ছেন আতিকুর রাহমান । ঘর থেকে বের হয়েই নওরিন বায়না ধরল চকলেটের জন্য । তা ও একটা না, ২১ টা কিটকেট নাকি কিনবে সে । শহীদ মিনারে সবাই ফুল দেয় । আর ও নাকি দিবে কিটকেট ।
 যাই হোক, আজ মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় মেয়েকে কিছু বলতে চাইলেন না আতিকুর রাহমান । চুপচাপ মেয়ের কথা রাখলেন । তবে ২১টা কিনে না দিয়ে দশটা কিনে দিলেন । পাশের দোকান থেকে একটা খাম নিয়ে ওটার ভেতর চকলেট গুলো ঢুকিয়ে নওরিন খামের উপর গুটি গুটি হাতে লিখল
 “ বাংলার নায়করা তোমাদের শুভেচ্ছা ।’’
 রিকশা থেকে নামল নওরিন আর ওর আব্বু । সারা রাস্তা র্যাললি দেখে আর গান শুনে এসেছে তারা । শহীদ মিনারের ওখানে ভীর থাকায় কিছুটা আগেই ওদেরকে নামতে হ । এটুকু রাস্তা হেঁটেই যেতে হবে । শহীদ মিনারের কাছে আসতেই আতিকুর রহমানের  মন কেমন যেন এক আনন্দ অনুভুতিতে ভরে উঠলো। তাকিয়ে দেখলেন নওরিনের দুই ঠোট ও দুই দিকে প্রসারিত হয়েছে । বাবা-মেয়ে দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভেতরের আনন্দ প্রকাশের জন্য একটু হাসলেন ।
 একটু পরে বাবা মেয়ে দুজনে আরও অনেকের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সবার মুখই হাসি হাসি । কেউ আলতো করে মুচকি হাসছে, কারো চোখ মুখ উদ্ভাসিত হয়ে আছে আর কেউ কেউ চোখ উজ্জল করে তাকিয়ে দেখছে সব কিছু।
 – “অদ্ভুত ব্যাপার তো! সবাই হাসছে কেন আব্বু ?” নওরিন প্রশ্ন করলো।
 – “হাসবেনা ? এ যে বাংলার অনুভুতি,বাংলা মায়ের হাসি । শহীদের প্রান্তরে যে এসেছে সবাই । বুকের আবেগ তো চুখে মুখে দেখা যাবেইরে মা । ’’

 নওরিন প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারের দিকে তাকাল । এতো মানুষের ভিড়ে ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছেনা যদিও, কিন্তু একটু একটু বুঝা যাচ্ছে । ফুলে ফুলে লাল হয়ে আছে মিনারের প্রাঙ্গণটা । নওরিনের ভাবতে ভালো লাগলো এগুলো ফুল না, এগুলো যেন শহীদের রক্ত । একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে (৮ ফাল্গুন, ১৩৫৯) বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি বর্ষণ করে এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্রযুবক শহীদ হন। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

আতিকুর রহমান মেয়েকে বেশ ভালো বাংলা  শিখিয়েছেন । উনার মন যেন শান্ত হতে চাইছেনা । অজানা এক উত্তেজনা তার মাঝে । সবার মতো তিনি ও চান বাংলার সবাই যেনো বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলার ই গান গায়, সবাই বাংলাদেশকেই ভালবাসে । কিন্তু আজকের এই যুগে হিন্দি চ্যানেল গুলো  যেনো বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । হঠাৎ করেই আতিকুর সাহেবের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল ।
 নওরিন তাকালো আব্বুর দিকে । আব্বুর মুখটা কেমন যেন শক্ত দেখাচ্ছে । কিন্তু এই দিনেতো আব্বুর মুখ শক্ত হবার কথা না । নিশ্চয়ই কঠিন কিছু ভাবছেন । কি যে এতো কঠিন জিনিষ ভাবেন আব্বু, নওরিনের ছোট্ট মাথায় তা ঢুকেইনা । নওরিন অন্য দিকে মন দিলো । বেশির ভাগ ছেলে মেয়েরাই সবুজ আর লাল কাপড় পরেছে । ছেলেরা মাথায় কি যেন বেঁধেছে ও । আর চারিদিক থেকে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে । গমগমে একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ।
 হঠাৎ করেই নওরিনের মাথা ব্যথা শুরু হল। সে আর ভেতরে যেতে চাইলোনা । আতিকুর রহমানের অফিসের কলিগরাও চলে এসেছেন শ্রদ্ধাঞ্জলি নিয়ে । আব্বু ডাকলেন নওরিনকে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য । নওরিন যেতে চাইলনা । আঙ্কেলরা জোর করলে সে বলল তার খুব মাথা ব্যথা করছে । ভেতরে সে যাবেনা আর । আতিকুর রহমান মেয়েকে গেটে দাড় করিয়ে বললেন এখানেই থাকতে, কোথাও যেন না যায় । নওরিন সুবোধ বালিকার মতো মাথা নাড়ল ।
আতিকুর রহমান আর তার কলিগরা শ্রদ্ধাঞ্জলি নিয়ে ব্যস্ত । নওরিনের হঠাত মনে হল, চকলেটগুলো তো রয়ে গেল । শহীদ মিনারে তো দেয়া হয়নি । এগুলো কি দেয়া হবেনা ? কিন্তু আব্বুতো বলে গেছে এখান থেকে না সরতে, যদি এখন ভেতরে যায়, তাহলে আবার বকবে । নওরিন ভাবতে লাগলো কি করা যায় ! হঠাত করে রাস্তার ঐ পাশে নজর গেল নওরিন এর । দুইটা দোকানের পাশে একটা খালি জায়গা । ওখানে বসে কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে কি যেন খেলছে । সবাই প্রায় ওর বয়সি । গায়ের কাপড় নেই কয়েকজনের, যাদের আছে তাও দেখার মতো না ।
 নওরিন এগিয়ে গেল ওদের দিকে, সবার হাতে একটা করে কিটকাট তুলে দিলো । চকলেট পেয়ে তাদের হাসি আনন্দ দেখে কে ? নওরিন নিজে ও একটা নিল, কিন্তু তারপর ও একটা রয়ে গেল ।
 সে ভাবছে ঐ একটা কিটকাট কি করবে, তখন ই পেছন থেকে একটি হাত এগিয়ে আসলো । সে ফিরে তাকিয়ে দেখে, আব্বু হাত বাড়িয়ে দাড়িয়ে আছেন । মুখের শক্ত ভাবটা বদলে গিয়ে এখন হাসিতে রূপ নিয়েছে । সে চকলেট টি আব্বুর হাতে দিয়ে ওদের সাথে খাওয়ায় মন দিল ।
 আতিকুর রহমানের  চোখে এক একধরনের মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছেন । শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে তিনি যতটা আনন্দ পান নি, মেয়েটার কাজে তো তার চেয়ে ঢের বেশী আনন্দ পেলেন । এটা যে তারই মেয়ে ভাবতেই গর্বে বুকটা ভরে উঠলো উনার ।
 শহীদরাও তো যুদ্ধ করে সবার মুখে হাসিই ফুটিয়েছেন । আজও তো এই নিঃস্ব বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটাল নওরিন । এ যেন এক অন্যরকম বিজয় । যে বিজয় সবার হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও সবাই পায়না । সে বিজয় আজ পেয়েছে নওরিন । ঠিক করলেন আতিকুর সাহেব, আর যতবার ই মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা আর বিজয় দিবস আসবে, তিনি সেগুলোতে অর্ধেক টাকা দিয়ে ফুল কিনবেন, আর বাকি অর্ধেক দিয়ে এইসব নিঃস্বদের মুখে হাসি ফুটিয়ে অন্যরকম বিজয় লাভ করবেন । যে বিজয়ের পথ আজ তাকে নওরিন দেখাল ।
 মুখে গর্বের হাসি ফুটিয়ে কিটকেটে একটা কামড় দিয়ে নওরিনের দিকে তাকালেন আতিকুর রহমান। বাচ্চাগুলো চকলেট খেতে খেতে হাসছে । নওরিন হাসছে হঠাৎ করে আতিকুর উনার  মনে হল, নওরিনের সাথে যেন তার লাল সবুজের জামা টাও হাসছে । এ যেন লাল সবুজ আর চকলেটের বিশ্বজয় । কেউ কোন কথা বলছেনা, তারপরও সবাই সবার মনের তৃপ্তি বুঝতে পারছে আর হাসছে । এ যেন মাতৃভাষার দিনে এক নতুন ভাষা আবিষ্কৃত হল আজ । এরপর থেকে তিনি এই ভাষাও জয় করবেন । করবেন ই ।

 নওরিনকে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন আতিকুর রহমান  । কাছেই কোথাও আবার বেজে উঠলো,
 “ আমি বাংলায় কথা কই,
 আমি বাংলার কথা কই,
 আমি বাংলায় হাসি, বাংলায় ভাসি,
 বাংলায় জেগে রই
 মুখের হাসিটা আবারো চওড়া হল উনার । যদি ও তিনি সবসময় নওরিনকে বেশি বেশি চকলেট খেতে বারণ করেন, তাও আজ আরও দুটো কিটকেট কিনে দিয়েছেন মেয়েকে নওরিনের আম্মুর জন্য একটা গোলাপ ও কিনলেন আজ ।
 এখন আতিকুর সাহেব রিক্সায় বসে বসে হাসছেন আর উনার মাথায় কবিতা এসেছেভাবতে লাগলেন আতিকুর সাহেব,
 “ শান্ত হল হৃদয় আমার বাংলা মায়ের কোলে…”
 পরের লাইনটা কি হতে পারে …?
 পরিশিষ্টঃ- বিকেলে মাঠে খেলা শেষে একটি ছোট্ট ছেলে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় একটা খাম পড়ে থাকতে দেখল । তাতে আঁকাবাঁকা করে কে যেন লিখে রেখেছে, “ বাংলার নায়করা, তোমাদের শুভেচ্ছা ।ছেলেটা কি ভাবল কে জানে ! কিছুক্ষণ পর শহীদ মিনারে রাখা বড় একটি শ্রদ্ধাঞ্জলির উপর খামটি রেখে চলে আসলো সে ।  অতঃপর কোন এক অজানা কারনে তার মুখে ও ক্ষীণ হাসি দেখা গেল


__ আহমেদ শুভ৯৬৯ 
ahmd shuvo969

বুধবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

বিশ্বাস(শুভ-পুস্পোর প্রেম অধ্যায়)

২০১৭  সালের বর্ষার কোন এক সময়।
সকাল ৯.৩০,আজ সারাদিন আকাশ মেঘে-নুপুরে বাঝছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি আকাশ প্রচণ্ড কালো । মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আবার থেমে যাচ্ছে।এমন দিনে সকাল আটটা বাজে রাকিব স্যারের ক্লাস, মেজাজ পুরাটাই ফরটি নাইন । সামান্য দেরী হলেই পার্সেন্টিস দেয় না । তাই তাড়াহুড়ো করে ছাতিটাও আনতে ভুলে গেলাম। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা।  এমন সময় কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে বেশ আমোদ লাগে। সাথে গাঢ় পিঁয়াজ ও চানাচুর দিয়ে মুড়ি ভাজার কথা নাই বা বললাম । যখন ছোট ছিলাম আম্মু প্রায় বর্ষায় মুড়ি ভাজা করে নিয়ে আসত। মানুষের আমোদের   পিছুটান গুলো খুব দুষ্টু হই, বার বার উস্কানি দেই। ব্যাচেলার হলে নাকি অনেক ইচ্ছের স্বাদ মাটির সাথে বিক্রিয়া করে দিতে হই।  আমি আজ তাই করছি।  অনিচ্ছাসত্ত্বেও রেগুলারিটি মেনটেইন করছি, ভদ্র ছেলের মত ক্লাসের প্রথম ব্যাঞ্চির উপর অধিকার স্থাপনের প্রচেষ্টায় আছি।

 ক্লাস করে বের হবো মাত্র এমন সময়ে ঝুম বৃষ্টি।
 আমরা যারা ছাতি আনিনি তাদের মধ্যে দু গ্রুপ তৈরি হলো ।.দাঁড়িয়ে থাকা গ্রুপ আর স্বেচ্ছায় বৃষ্টির হাতে আত্মসমর্পণ গ্রুপ । পরের গ্রুপটিতে দু-তিনজন ছাড়া আর কেউ আগ্রহ দেখালোনা । অনেকে মাথার উপরে ব্যাগ-ট্যাগ  দিয়ে দৌড়ে চলে যাচ্ছে । আমি ধীরে ধীরে বৃষ্টির মধ্যেই হাটা শুরু করলাম । সরাসরি হলে যাবো নাকি ক্যাফেটেরিয়ায় যাব ভাবছি । অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যাফেটেরিয়া থেকে এক কাপ গরম চা খেয়ে যাবো।  বেশ ঠাণ্ডাবোধ করছি,শরীলের উষ্মতা প্রয়োজন আছে তাই সোজা ক্যাফেটেরিয়ায় চলে গেলাম । ক্যাফেটেরিয়ায় তেমন মানুষ জন নেই । পিছনের দিকে এক জোড়া কাপল ল্যাপটপে সম্ভবত কিছু দেখছে । আর একজন জানালা পাশে বসে বৃষ্টি দেখছে,  শিঙাড়ার শেষ অংশটুকু হাতে ধরে । আর আমি চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে আছি । পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফেইসবুকে লগইন করলাম । না কেউ ম্যাসেজ দেয় নি । দুই একটা নোটিফিকেশন চেক করলাম। হোম পেইজে নতুন একটা ভালোবাসার গল্প দেখলাম । হায়রে ভালোবাসা ! মাঝে মাঝে একটা হাতের এতো প্রয়োজন অনুভব করি কিন্তু সেই হাত বাড়ানোর কোনো মানুষ নেই । এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে গেছি ।

চা খাচ্ছি আর গল্প পড়ছি।  বলা যায় আশেপাশের পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ  বিচ্ছিন্ন । হঠাৎ পানির ছিটায় আবার বাস্তব জগতে ফিরে আসলাম । আমার খুব কাছে দাঁড়িয়েই দুইটা ছেলে আর তিনটা মেয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো । কোন কারনে একটা মেয়ে একটা ছেলেকে গ্লাস থেকে পানি ছিটিয়ে মারতে গিয়ে ইস্ আমার গায়ে মিস টার্গেট।  কখন আসলো এরা ? আমার গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়ার পর পুরো গ্রুপটা চুপ মেরে গেলো। যে মেয়েটি পানি ছিটিয়েছিল , বসে ছিলাম বলে তাকে এতক্ষন ঠিক মতো দেখতে পারছিলাম না। মেয়েটি আমার সামনে এসেই খুব অনুনয় করে সরি জানালো । কিন্তু মেয়েটাকে দেখে আমি অনুভূতি শুন্য হয়ে গেলাম । মানুষ এতো কিউট হয় কিভাবে? ঠিক যেন পরী থুক্কু  পরী না পরীর চাইতে বেশি  কিন্তু আমি তো কখনো পরী দেখিনি ! নীল ফ্রেমের চশমা পরা । রেশমি চুল । ফ্যানের বাতাসে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে বারবার ওর মুখের উপর আছড়ে পড়ছে । মেয়েটি আমার কাছে শুনতে চাচ্ছে " ওকে,  ঠিক আছে, সমস্যা নেই " এমন কিছু । কিন্তু আমি কিছুই না বলে হা হয়ে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পর যখন ওরা হইতো  বুঝলো  আমি কিছুই বলবনা তখন  নিজেরাই লজ্জায় ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে গেলো । আমি কি খুব অদ্ভুত একটা কাজ করে ফেললাম। মিনিমাম " ইটস ওকে " টাইপের কিছু একটা  রিস্পন্স দেওয়া উচিৎ ছিল !

আমি একা একা হাঁটতে  পছন্দ করি । আগে কোন উদ্দেশ্য থাকতো না । এখন সেই রেশমি  চুল ,নীল ফ্রেমের চশমা পরা মেয়েটিকে দেখার জন্য হাঁটি ।  কখনো কল্পনায়ও আসেনি একটি মেয়ে আমার ভালোবাসার  অনুভূতিতে এভাবে  লেগে যাবে।

আজ ভার্সিটি  জন্ম দিবস।   সবাইকে   ডিপার্টমেন্ট  থেকে গেঞ্জি দিলো । সব ডিপার্টমেন্ট  থেকে র‍্যালি  বের হলো । মেয়েদের  থেকে যখন র‍্যালি  এসে ছেলেদের সাথে যোগ দিলো তখন ছেলেদের উল্লাস ধ্বনি আরও বেড়ে গেলো ।কিন্তু আমি খুঁজছি সেই নীল ফ্রেমের চশমা পরা এবং রেশমি  চুল ওয়ালী মেয়েটিকে । কিছুক্ষন খোঁজার পর তাকে না দেখে হতাশ হয়ে পড়লাম। আজ সারাটা দিন এমনি গেল  কোথায় তার দেখা পেলাম না । বিকেল ৫ টার দিকে কন্সার্টের স্টার জলসা। বেশ নামি দামি বেন্ড দল আসবে। মিস করা মোটেই ঠিক হবেনা। তাই সোজা অডিটোরিয়ামের পথ ধরলাম,  কনসার্টে বেশ জোরালো চলছে অডিটরিয়ামে। কিন্তু আমি অপেক্ষায় আছি সে নীল মানবীকে খানিক একটু দেখতে। হঠাৎ অন্য পাশের দরজা দিয়ে একসাথে চার পাঁচটা মেয়ে ঢুকল । ঐ পাঁচ জনের মধ্যে ঐ মেয়েটিও ছিল ।। মেয়েটি গাঢ় নীল একটা শাড়ি পড়েছে। এমনিতে নীল শাড়ি আমার খুব পছন্দ  তার মধ্যে সুন্দরি মেয়ের শরীলে । আজ আরও বেশি সুন্দর লাগছে তাকে। পুরো কনসার্ট জুড়ে আমি তার দিকে তাকিয়েই রইলাম । মেয়েটির একবার আনমনে এপাশ ওপাশ তাকাতে গিয়ে আমার সাথে চোখে চোখ পড়লো । এরপর থেকে মেয়েটিও মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছে যে আমি ওকে দেখছি কিনা। রাত আটটা বাজলে মেয়েদের হল বন্ধ হয়ে যায় । তাই মেয়েরা আটটার দিকে বের হয়ে গেলো  মেয়েটি অডিটরিয়াম থেকে বের হবার সময় আমার দিকে একবার আড় চোখে তাকালো । হইতো  কোনো অদৃশ্য টানের বলে আমিও সাথে সাথে সীট থেকে উঠে ওর পিছু নেয়া শুরু করলাম । কিছুদিন যাবৎ এক টানা বৃষ্টি হচ্ছে । আজ সারাদিন বৃষ্টি হয়নি তবে এখন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। মেয়েটির হাতে কোন ছাতা নেই । সবচেয়ে অবাক হবার ব্যাপার হচ্ছে মেয়েটার সাথে কোন বান্ধবী নেই । এখন অডিটোরিয়াম এর সামনে কোন রিকশাও নেই । আমি এই সুযোগ হাতছাড়া করতে পারলাম না ।দ্রুত মেয়েটির সামনে গেলাম।

-ক্যামন আছো ? আমাকে চিনতে পারছো ?
একটু বিব্রত স্বরে আমি বললাম

-হম চিনছি ! আপনি সেই হা বাবা ! আজ সারাক্ষন ও হা করে ছিলেন আমার দিকে তাকিয়ে।

আমি না শোনার ভান করে বললাম
-তোমার বান্ধবীরা কোথায় ?

-ওরা তো আসেনি

-দেখলাম যে একসাথে ঢুকলে চার পাঁচ জন ?

-আমি ওদের সাথে আসিনি ।

-তুমি কোন ইয়ার ?

-ফার্স্ট ইয়ার । আপনি?

-সেকেন্ড   ইয়ার

- বড় ভাই !

- হুম।

-ভাইয়া ! একটা রিকশা ঠিক করে দিতে পারবেন? আমার হল বন্ধ হয়ে যাবে এখনি

-ওকে দাঁড়াও

বৃষ্টির মাঝে আমি রিক্সা খুঁজতে নামলাম । জীবনে রিক্সা খোঁজার মাঝে   কোনদিন আনন্দ  পাই নি। তবে আজ পাচ্ছি, রিক্সা যত দেরি তে পাওয়া যাবে আনন্দ স্থায়িত্ব তত বেড়ে চলবে, সমানুপাতিক বলা যায়। অবশেষে রিক্সা পাওয়া গেল। মনে মনে রিক্সা ওয়ালাকে কয়েক ডুজ গালি মেরে দিলাম। "পিঁপড়ার বাচ্চা আর কোন জায়গা পেলিনা,এখানে আসতে হল তোর"।  কুত্তার একটি মূল্য আছে বিদেশীরা কুত্তাকে ফ্যামিলির একজন সদস্য  মনে করে। সেই দিক দিয়ে পিঁপড়ার বাচ্ছা কুত্তার বাচ্ছার চাইতে উত্তম গালি ইংরেজিতে বলতে গেলে বলা যাবে son of ant। যাইহোক  মেয়েটি রিক্সায় চলে যাবার সময় আমাকে থ্যাঙ্কস জানালো ।তখনো  আমি রিপ্লাই দিতে ভুলে গেলাম । সত্যিকারের হা বাবার মতো আবার তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।

আকাশী নীল শাড়ী ,
নীল টিপ ,
নীল ফ্রেমের চশমা ,
রেশমি  চুল সব কিছু
আর একটু ভালোবাসা।

আমার মাথা একেবারে গোব্লেট করে দিচ্ছিলো ।
মেয়েটি চলে যাবার পর আমি জিভে কামড় দিলাম। ধেৎ  তার নামটাই জানা হয়নি। এত বড় ভুল হা-বা গোবা ছেলেরাও তো করেনা। । এরপর নিয়মিত সোজা রাস্তায় না এসে দুই কিলোমিটার দুরে ঘুরে ওদের ডিপার্টমেন্ট এর সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করতে লাগলাম । কোন নীল ফ্রেমের চশমা পরা মেয়ে দেখলেই তাকিয়ে থাকি।বন্ধুরা এর মধ্যে লুইচ্চা নাম উপাধি দিয়ে দিল। তবুও আমি একটু সচেতন হলাম না।যাইহোক  মেয়েটিকে একদিন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে দেখলাম । আমি সাথে সাথে কোন কিছু কেনার ভাব করে ঢুকলাম ।

-মামা ! এক হাজার টাকার ভাঙতি হবে ?

-না মামা !

দেখি ও একা দাঁড়িয়ে কিছু চানাচুর , বিস্কুট ,চিপস কিনছে । এখন যদি কথা না বলতে পারি তবে কিছুই হবে না । ও আমাকে খেয়ালই করলো না ।ও যখন টাকা দিয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে বের হয়ে গেলো, সাথে সাথে আমিও বের হলাম ।আমাদের   ডিপার্টমেন্ট ভবনের সামনে চলে আসতেই ওর পাশে গিয়ে বললাম ,

-"তোমার নামটাই তো জানা হল না"

ও কিছুটা চমকে গেলো ।পরক্ষনেই নিজেকে সামলে বলল
,-"ওহ আপনি!! আমি পুস্পিতা  ডাক নাম পুস্পো। "

-"খুব সুন্দর নাম তো।আমি শুভ।"

ও হাসি দিয়ে বলল , হুম !

-"তোমার ফেইসবুক আইডি আছে ?"

-"নাহ"

কই কি এই মেয়ে, কোন গ্রহে বসবাস করে??
-"ওহ ! এই যুগের একটা মেয়ের ফেইসবুক আইডি নেই ? খুব অবাক হলাম !"

-"ভাইয়া ! এসব আমার ভালো লাগে না"

-"হুম ! ফেইসবুক আসলেই ভালো না । আমিও ছাড়তে চাচ্ছি। একবারে চীরদিনের জন্য ছাড়বো । কিন্তু আমার একজন ভালো বন্ধু দরকার । মনে করো বাস্তব জগতের বন্ধু।তাহলে ছেড়া দেওয়া আরো সহজ হই যাবে?"

-"হুম ভালো। "

তখন কিছুটি সময় নিয়ে হুট করে বলে বসলাম  ।
 -"তুমি কি আমার বন্ধু হবে ?"

-"হাহাহা। আমার লাভ কি ?"

তার হাসি দেখে মেজেটা আকশে উঠে গেল।যাইহোক মেজাজ আকাশে রেখে শান'ত গলায় বললাম
-"বন্ধুত্তের মোড়কে বিশ্বাস উপহার দেবো তোমাকে। আর বিশ্বাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় । প্রতিটা মানুষের একজন বিশ্বাসী বন্ধুর প্রয়োজন হয় । আমি সেই মানুষটি হতে চাই"

-"আপনাকে বিশ্বাস করবো কি করে ?"

-"নিজেকে বিশ্বাস করো ?-"

-"জানিনা"

-"তাহলে কি করে বুঝাবো ?"

-"আপনি যদি অন্য ছেলেদের চেয়ে ভিন্ন না হন তাহলে ওদেরকে বিশ্বাস না করে আপনাকে বিশ্বাস করবো ক্যান?"

এমন কথা শুনে আমি চুপ মেরে গেলাম । আসলেই কিভাবে বুঝাবো  আমি অন্যদের থেকে ভিন্ন । যে কখনো বিশ্বাস ভাঙবেনা । যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বিশ্বাস এর জন্য পথ তৈরি করবে । এমন কি করা যায় হঠাৎ যাতে সে বিশ্বাস করে আমি সবচেয়ে বিশ্বাসী।আমি সবচেয়ে ভিন্ন ।আমি সবচেয়ে যোগ্য তার জন্য ।

-"তুমি বলো আমি কি করবো ?"

-"আমি কেন বলবো ? আপনি এমন কিছু বলেন যাতে আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি । তবে প্লীজ,  আমি কোন ভায়োলেন্স চাই না । সিনেমার মতো হাত কেটে আমাকে লাভ লেটার দেয়া কিংবা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল করতে যাবেন না ।আমি এসব প্রচণ্ড অপছন্দ করি । "

তাহলে ভালো হল হাত কাটা থেকে রেহায় পাওয়া গেল,সে জিনিসটি আমি খুব ভয় পাই। নিজের ক্ষতি করা কি লাভ। তারপর আমি বিড়বিড় করে বললাম
-"আগে বন্ধু হবার তো সুযোগ দাও । তাহলেই বুঝবে আমি ক্যামন !"

-"আপনাকে আমি বন্ধু করলে তো হলই । কিন্তু আপনাকে আমি কেন বন্ধু করবো সেটা আমাকে বলবেন না ?"

-"কারন তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকেই সব সময়  তোমাকে নিয়ে চিন্তা হই"

-"আমি যদি বলি অন্য কেউ ও আমাকে নিয়ে চিন্তা
করে ? এখন সেই অন্য কেউ কে বাদ দিয়ে ক্যান
আপনাকে বন্ধু বানাবো ?"

মেয়ের তো দেখি রেশমি  চুলের   মধ্যে  ভীষণ প্যাঁচ!!!। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। বড্ড প্যাঁচের মধ্যে পড়ে গেলাম । সত্যিই নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিলো । বন্ধুরা আমাকে সবসময় কথার পণ্ডিত বলে আখ্যা দেয়, আজ যেন সব কথা পুরিয়ে গেল আমি চুপ হয়ে দাঁড়িয়েই রইলাম। মনে হচ্ছে খুব বড় অপরাধ করে ওর সামনে অপরাধ স্বীকার করছি । আমি বললাম ,
-"আমি কখনো ওভাবে চিন্তা করিনি । আমাকে ভাবতে হবে । "
তখন পুস্পো   ঠোটের কোনে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল ,
-"আপনি ভাবতে থাকেন । আর যেদিন প্রমান করতে পারবেন  আপনি সবার থেকে ভিন্ন , সবার থেকে বিশ্বাসী । সেদিন আমরা বন্ধু হবো । ক্যামন ? ভালো থাকবেন । আমাকে যেতে হবে ।"

এই কথা গুলো বলে পুস্পো  চলে গেলো । আমি
সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম ।  রুমে এসে বিশাল টেনশনে পড়লাম । কি করবো কিছুই মাথায় আসছেনা । ছোট ক্যাম্পাস । এক মেয়ের পিছনে কয়েকদিন ঘুরলেই জানাজানি হতে টাইম লাগবেনা । প্রেসটিজ পুরা পান্তা ভাত হয়ে যাবে । পরের দিন ক্লাস করে আনমনেই ওদের ডিপার্টমেন্ট এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । ওর ক্লাস কখন শেষ হবে অথবা শেষ হয়ে গেছে কিছুই জানিনা । ক্লাস টাইমে ওদের ডিপার্টমেন্ট এর সামনে আর বিকেলে ওদের হল থেকে একটু দূরে  পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার বদ অভ্যাসে পরিনত হল । তবে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কিছুদিন এর মধ্যে ওর ক্লাস এর সময় সূচীর একটা আনুমানিক ধারনা পেলাম । রবিবার ল্যাব আছে বিকেলে । সোমবার আর মঙ্গলবার সকাল দশটা ত্রিশ এ ক্লাস শেষ হয় ......। শুধু ক্লাস না ও বিকেলে কবে কখন হাঁটতে কিংবা ঘুরতে বের হয় তার ও একটা আনুমানিক ধারণা পেলাম । দুই সপ্তাহে অন্তত একবার মাইঝদি  ঘুরতে যায় বান্ধবীদের নিয়ে । তবে অবশ্যই বৃহস্পতি বার পছন্দের রেস্তোরাঁ কাউন্ট্রি লাউঞ্জ । ক্যাম্পাসে ঘুরলে সন্ধ্যার পর বের হয় । চালাক মেয়ে । সাথে দুজন বডী গার্ড বান্ধবী থাকে । আর কিছু কষ্টকর তথ্য পেলাম । ডিপার্টমেন্ট এর অনেক ছেলেই ওর উপর ক্রাশ । স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে কারো প্রতি ওর কোনো আগ্রহ নেই । কয়েকটি ছেলে পিছু নিলে মেয়েরা এমনি হই, মোড ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। খারাপ না তদন্তের অগ্রযাত্রা ভালোই চলছে।

আজ আমাদের মাত্র একটি ক্লাস হল । আমি ক্লাস শেষে ওদের ডিপার্টমেন্ট এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি । আকাশ টা আজও খুব কালো । যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। মাঝে মাঝেই অনেক দূরে বিজলী চমকাচ্ছে । পুস্পো যখন ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্ট ভবন থেকে বের হল তখন বৃষ্টির মাত্রা অনেক বেড়ে গেল । ও আমাকে দেখে নিচে তাকিয়ে হালকা একটা হাসি দিয়ে ওদের হলের দিকে হাটা শুরু করলো । আমিও একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ওর পিছে আপন মনে হাঁটতে লাগলাম ।ঠিক   সিনেমার ভদ্র ঘুন্ডারা যেমন সুন্দরি নায়িকাদের পিছু নেই, তবে ভদ্র ঘুন্ডারা নায়ক হই তাই আমার নিরুৎসাহিত হওয়ার কিছুই নেই। ওর হাতে খুব সুন্দর একটা রঙিন ছাতা । মাঝে মাঝে ছাতাটা একটু নিচু করে পিছনে ফিরে আমাকে দেখছে । বৃষ্টির পানিতে আমার শার্ট প্যান্ট ভিজে একাকার অবস্থা । আমার চুল থেকে পানি আমার গাল বেয়ে বেয়ে নিচে গড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে পানির প্রবল গতিবেগ এর কারনে সামনের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে । ওর হলের কিছু দূরে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম । ও হলের গেট দিয়ে ঢোকার সময় ও একবার আমাকে দেখে নিলো । আজ ও অনেক বার তাকিয়েছে। এই তাকিয়ে থাকা কে কি বলে আমি জানিনা।  এটা কি প্রশ্রয় ? নাকি পরে তোকে দেখে নেবো টাইপ লুক ছিল ? কিছু বুঝলাম না।।

পরের দিন পুস্পো  বাসে তিন নম্বর সারিতে বসে আছে। আজ তার মাইঝদি তে ঘুরতে যাওয়ার সময়। বাসে প্রচণ্ড ভীর । শ্বাস করার ও জায়গা নেই । আর আমি পিছনের গেটে বাঁদরের ন্যায় ঝুলে আছি । বাস এর গেটে ঝোলার অভ্যাসটা  কলেজ লাইফ  থেকে পাওয়া । বাস চলছে আমি গেটে দাঁড়িয়ে বাতাস খাচ্ছি। পুস্পো মাইঝদি তে  নামলো । সাথে দুজন বান্ধবী  আর ঐ ছেলে দুটি । আমি ও নেমে গেলাম আর টিকটিকির মত ওদের পিছু লেগে আছি। ওরা একটা ফাস্ট ফুড এর দোকানে ঢুকে গেলো। আর আমি পাহারাদারের মত বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম একটু দূরে । কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বিদ্যুতের বেগে ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে সে বেরিয়ে এলো । পিছনে আরেকটি মেয়ে ওকে ডাকছে , পুস্পো ! এই পুস্পো ! আমি বোঝার চেষ্টা করলাম কি হয়েছে । এখন ওরা সবাই বের হয়ে এসেছে। আমি ওদের খুব কাছেই হাঁটতে লাগলাম ।

একটা মেয়ে ওদের মধ্যে একটা ছেলেকে বলছে ,
-এতো দ্রুত প্রপস করতে গেলি ক্যান গাধা ?

 এই কথা শুনেই আমার বুকে প্রচণ্ড আঘাত লাগলো । মাথা টা ঘুরছে, মনে হচ্ছে পায়ের নিচে মাটি নেই। আমি আর ওদের পিছু নেয়া ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম । এতো খারাপ লাগছে আমার কি করবো বুঝতে পারছিনা।কেন জানি মনের মধ্যে করুণ বেদনার নিত্য বাজিতেছে। আমি হাইওয়ে রোড ধরে একা একা হাঁটতে লাগলাম । আজ মাইঝদির রাস্তা গুলো এমনিতেই ফাঁকা ফাঁকা  একদম যানবাহন শুন্য অবস্থা । আমি একটা ছোট রাস্তার মধ্যে সামান্য ভীর দেখে ঢুকলাম । দেখলাম একজন অন্ধ লোক গলা ছেড়ে লালন গীতি গাইছে

" মিলন হবে কত দিনে ?
আমার মনের মানুষের ও সনে ? "

এতো সুন্দর কণ্ঠ আমি কখনো টিভি কিংবা  রেডিওতে শুনিনি । একেই বলে প্রকৃতি প্রদত্ত কণ্ঠ । সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে ওনার কাছে গান শিখতে পারতাম ! আর এভাবে রাস্তায় গলা ছেড়ে গাইতে পারতাম !গানের সুরে সব কষ্ট, ইচ্ছে,আশা দুর করতে পারতাম। মানুষের চাওয়ার বোঝাটা এক একটা পাহাড়ের চাইতে কম নই। তার মাঝে বড় পাহাড় প্রেমের বোঝাটা। গান শুনছি, মাথাটি অনেক ভার অনুভব করছি ।শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে আর খুব শীত শীত লাগছে । এখানেই ঘুমিয়ে পড়তে খুব ইচ্ছে করছে।  বুঝতে পারছি আমার জ্বর আসছে । কিভাবে অতদুর যাবো ? প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে তবুও কিভাবে কিভাবে যেন অটো রিক্সায় চলে আসলাম ক্যাম্পাসে । রাতে ধুম জ্বর উঠলো। খুব ঠান্ডা লাগছিল,  কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে, সারা শরীলে কেমন জানি ব্যথা, কম্বলের ভিতর দিয়ে একটু একটু কেঁপে উঠছি। তবুও মাথার মধ্যে সেই লোকটার গান " মিলন হবে কত দিনে ? আমার মনের মানুষের ও সনে ? " বাজছে । আমি হারিয়ে গেলাম গভীর অচেতনে ।




 রাতে খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম । দেখলাম পুস্পোকে নিয়ে আমি নদীর পাশে হাঁটছি । পাশে বড় বড় সাদা কাশ ফুলের বাগান । একটু পর পর সেই কাশফুল গুলো বাতাসের তালে তালে মাথা নুয়ে আমাদের অভিবাদন জানাচ্ছে । পুস্পো একটু পর পর রাগ করে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । আমি ওর পিছে হাঁটছি ওকে ধরার জন্য । মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে আমি ক্যাম্পাসে হাঁটছি ওর পিছু পিছু । কিন্তু সেই গানটি এখনো শুনছি আমি । মনে হচ্ছে বহুদূর থেকে ভেসে আসছে । একসপ্তাহ জ্বরের ঘোরে একদম বেহুশ ছিলাম আমি।

দুইটা ক্লাস টেস্ট , তিনটা প্র্যাকটিকাল ক্লাস মিস করেছি । এতো দুর্বল ছিলাম যে বন্ধুরা রিক্সায় করে ( আমার হল থেকে মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা ) মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আনলো । ডাক্তার বলেছে ভাইরাস জ্বর। প্রেমের সুত্র থেকে ভাইরাস  জ্বর ভাগফল নাকি ভাগশেষ কোন্ সুত্র কাটানো যায়?  মাথায় আসছেনা। কিছু বুঝলাম না! পুস্পো ঐ ছেলের প্রপোস করার সাথে আমার ভাইরাস জ্বরের কি সম্পর্ক । কোন সুত্র মিলেনা,মনের বিজ্ঞান অনেক কঠিন বিজ্ঞান। আর মেয়ে জিনিসটির সমীকরণ পৃথিবীর সব চাইতে কঠিন সমীকরণ যার আদৌ সমাধান আছে কিনা কি জানি।  এক সপ্তাহ পর জ্বর কমে গেলো ।কিন্তু শরীর প্রচণ্ড দুর্বল। পুস্পোকে দেখা হয়নি কতদিন !

ওহ ! আমি আজ শেষ বার এর মতো দাঁড়িয়ে আছি । আমি পুস্পিতাকে বলবো ,"আমি আসলে নিজেকে তোমার বিশ্বাসী প্রমান করতে ব্যর্থ হয়েছি । এতদিন যা করেছি তার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও " ।এই বলে প্রেম খেলা থেকে চির বিদায় নিব, জীবনানন্দ দাশের জন্য কবিতা এসেছে বিজ্ঞান নই। সবার  দ্বারা সব কিছু সম্ভব  হই না আমাকে দিয়ে হইতো প্রেম বস্তুটা গিলানো সম্ভব না।
আমি ওদের ডিপার্টমেন্ট এর সামনে দাড়িয়ে আছি। আজ এতো রোদ ! মাথার মধ্যে ঝিম ঝিম ব্যথা শুরু হয়েছে । মাথার দু সাইডে টিকটিক শব্দ শুনতে পাচ্ছি । আমার কি আবার জ্বর উঠবে নাকি ?
পুস্পো ওদের ডিপার্টমেন্ট  থেকে বের হয়ে আসার পর আমি ওর পিছু নিলাম । ও অবশ্য আমাকে দেখেনি ।কিন্তু হাঁটার সময় অনুভব করলাম আমার প্রচণ্ড দুর্বল লাগছে । পা আর আগাচ্ছেনা ।আমি মাতালের মতো এলোমেলো পা ফেলছি । উফফ ! সব কিছু আঁধার হয়ে আসছে ক্যান ?আমার এমন লাগছে ক্যান!!
পুস্পোকে এখনই ডাকতে হবে ।ঐ তো সামান্য সামনে আছে । আমি সর্বশক্তি দিয়ে পুস্পো  বলে চিৎকার করে ডাকলাম । মেয়েটা শুনতে পেলো কিনা কি জানি!!!





 এরপর আমার আর কিছু মনে নেই। চোখ মেলে দেখি আমি মেডিকেল সেন্টারে শুয়ে আছি। আমার হাতে স্যালাইন লাগানো । আমার আশে পাশে যে অনেক উৎসুক জনতার ভীর সেটা আমি না দেখেই বুঝতে পারছি । ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন
" এখন ক্যামন লাগছে ? "

-"এইতো ভালো !"

-"রোদের মধ্যে সম্পূর্ণ হাটা নিষেধ । ছাতা নিয়ে হাঁটবে। মনে থাকবে ?"

আমি কিছু বললাম। ডাক্তার এর রুম থেকে বের হয়ে হয়ে দেখলাম পুস্পো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে । পুরাটাই অবাক, "এই মেয়ে আবার এখানে আসল ক্যান?"

-"তুমি এখানে ?"

-"আমাকে ডাক দিয়ে অজ্ঞান হলে আমি কি করবো ? আপনার জন্য ক্লাসটা মিস গেল। ক্ষতি পূরণ দিতে হবে।"
আমি কি বলব কিছু বুঝতে পারলাম না। পুস্পোর মুখে লাজুক হাসি । ও আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমাকে চেয়ে চেয়ে তার অনেক বছরের কোন এক তৃপ্তি পূরণ হচ্ছে।





এই প্রথম ক্যাম্পাসে পুস্পোর পাশাপাশি হাঁটছি শুধু পুস্পো না ক্যাম্পাসে কোন মেয়ের পাশাপাশি হাঁটাটাও প্রথম। মাঝে মাঝে ওর ডান হাতের আঙুল ছুঁতে চাচ্ছি কিন্তু ও আঙুল সরিয়ে নিচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে । পুকুর  পাড়ে আসার সাথে সাথে আবার অঝোরে বৃষ্টি শুরু হল। পুস্পো ওর বিশাল হ্যান্ড ব্যাগ থেকে কালারফুল টিপ ছাতাটা বের করে দুজনের মাথার উপর ধরলো । কিন্তু আমার মাথার সাথে একটু পর পর বাড়ি লাগছে ছাতার সাথে ।

" দাও ! আমি ধরি ছাতাটা "

-"নাহ আমি ধরবো"

-"আমি যে বাড়ি খাচ্ছি একটু পর পর ।"

-"এতো লম্বা ক্যান তুমি ?"

-"মানুষ লম্বা বি এফ এর জন্য পাগল ।আর মেয়ে কি বলে এসব ?"

-"হুম তোমারে বলছে ? "

-" আমি জানি"

-"কিভাবে জানো, আগে নিশ্চয় প্রেম করছে"

-"কল্পনায় করেছি তবে এখন বাস্তবে করছি।আচ্ছা দাও দুজন মিলে ধরি ।"

আমি ছাতি ধরার ছলে ওর হাত শক্ত করে ধরলাম । জানিনা ও কি অনুভব করছে এখন ! শুধু কি আমার হাতের উষ্মতা নাকি প্রবল বিশ্বাস ?

(বি:দ্র: আমি এখনো ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে,গল্প সাজানোর উদ্দেশ্যে এক বছর বেড়ে গেলাম,আর পুস্পিতা নামে কোন এক নীল পরী আমার জীবনে একদিন না একদিন ছোঁয়া দিবে এটা আমার  বিশ্বাস  ও প্রবল প্রেমের অগ্রিম তৃপ্তি )

_____আহমেদ শুভ৯৬৯

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৬

স্বপ্ন(কবিতা)

____________

আপত্তি না,ফিরেও দিওনা।
শুধু কিছু স্বপ্ন  নিতে চাই,
আর নিজের শুকনো স্বপ্নগুলো ভিজাতে চাই।


___আহমেদ শুভ

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৫

আমরা সৃষ্টিকর্তাকে দেখিনা কেন?


কোরানের একটি আয়াত দিয়ে শুরু করছি, নাস্তিক ভাইরা দম নিয়ে একটু পড়ুন।
......বিশ্বলোকের কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন।(৪২:১১)

হযরত মুসা (আ), সৃষ্টিকর্তা দেখতে চেয়েছিলেন।তিনি অনেক ভাগ্যবান ছিলেন যে বেশ কয়েকবার তিনি সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলেছিলেন। হযরত মুসা (আ), সৃষ্টিকর্তার একজন প্রিয় ব্যক্তি হয়েও সৃষ্টিকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন তিনি( মুসা আ) সৃষ্টিকর্তাকে কখনো দেখতে পারবেন না

উপরের (৪২:১১) আয়াত স্পষ্ট ধারণা দেয় মহান সৃষ্টিকর্তার পবিত্র সত্তা আমাদের চিন্তা চেতনার ঊর্ধ্ব। তিনি এই মহাবিশ্বে অবস্থিত কোন কিছুর অনুরূপ নই এটাই হল তাকে দেখতে না পাওয়ার মূল কারণ।আধুনিক বিজ্ঞান দিয়ে এই জটিলতা কোনভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়? ব্যাপার টুকু অনেকটা কষ্টকর, তবুও আমি চেষ্টা করেছি জটিলতা পরিহার করে সহজ পথ নিয়ে ব্যাখ্যা করতে।যারা বিজ্ঞান বুঝেন না তারাও একটু চেষ্টা করলে চমৎকার ভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন।

আমাদের এই জানা মহাবিশ্বে যা কিছু আছে,যা কিছু আমরা দেখি সব ত্রিমাত্রিক (3 dimensional space) । আমাদের গঠন, চিন্তা,চেতনা, কল্পনা, অনুভূতি, বোধগম্যতা সব এই ত্রিমাত্রিক স্পেস (3 dimensional space) ও একমাত্রিক সময়( 1 time) এর মধ্যে ঘুরপাক খাই(3 space + 1 time)।আমরা শত চেষ্টা করলেও এই ত্রিমাত্রিক স্পেস (3 dimensional space) ও একমাত্রিক সময়( 1 time) থেকে বের হতে পারবো না সেটি কল্পনায় হোক যাই হোক।

সর্বাধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের তত্ত্ব ( string theory) অনুযায়ী মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় দশটি স্পেস-টাইম (space -time) ডাইমেনশন(dimension) ছিল।তার মধ্যে তিনটি ডাইমেনশন(dimension) এবং একটি টাইম মিলে আমাদের এই মহাবিশ্ব গঠিত যা আমরা দেখি,কল্পনা করি, এই সব কিছু তিনটি ডাইমেনশন(dimension) এবং একটি টাইমের মধ্যে। এখন প্রশ্ন উঠে আর ছয়টি গেল কই!!
string theory অনুযায়ী আর ছয়টি অকল্পনীয়ভাবে সংকুচিত অবস্থায় আছে(compact dimensions of space)

মহান সৃষ্টিকর্তা কমপক্ষে দশটি মাত্রা ব্যবহার করেছেন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য।তাইতো এই মহাবিশ্বের গঠন ও সৃষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত ঘটনা বর্ণনার জন্য আমাদের অন্তত দশটি মাত্র দরকার। কিন্তু আমরা তিনটি মাত্রার মধ্যে সীমিত। এখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল কোন ব্যক্তি আমাদের এই তিনটি মাত্রায় না থেকে অন্য ছয়টি মাত্রার যেকোন একটি বা একাধিক মাত্রায় থাকেন তাহলে আমরা তাকে দেখতে পারবো না এমনকি কোন যন্ত্র দিয়ে সম্ভব না। বর্তামানে আস্তিক বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস রাখে মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই তিনটি ডাইমেনশন বা মাত্রার বাইরে থেকে আমাদের নিকটে আছে তাই আমরা তাকে দেখতে পারিনা কিন্তু তিনি আমাদের দেখতে পারেন।

এখন একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয় টি আরো সহজ করে দিচ্ছি। একটি জগত কল্পনা করুন যেখানে শুধু দুটি মাত্র বা ডাইমেনশন এবং একটি সময় বা টাইম আছে অর্থাৎ উক্ত জগতে যা কিছু আছে তা হল (x,y,z=0,t)
এখন ধরুন জগতটিতে দুজন কাল্পনিক মানব ও মানবী আছেন যারা হল মি M এবং মিসেস N.। মি M, মিসেস N কে দেখলে মি M. এর কাছে মনে হবে মিসেস N একটি সরলরেখার অংশবিশেষ। কারণ তাদের ডাইমেনশন দুই মাত্রিক (x,y,z=0)।যদি মি M মিসেস N কে পুরাপুরি দেখতে চাই তার চতুরদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে। কিন্তু ত্রিমাত্রিক আপনি কিংবা আমি(x,y,z) একই সময়ে মিসেস N কে পুরাপুরি দেখতে পারব।
আবার ধরুন মিসেস N ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করর ঘুমাচ্ছে। কিন্তু মি M তাকে দেখতে চাইলেও পারবেনা যেহেতু দরজা জানালা সব বন্ধ।অথচ আপনি কিংবা আমি (x,y,z) দেখতে পারব যদিও মিসেস N দরজা জানালা বন্ধ করর ঘুমাচ্ছে।
সুতরাং স্পষ্টত দুইমাত্রিক( 2 dimensions) জগতের কেউ আমাদের থেকে কিছু লুকাতে পারবেনা।
অনুরূপভাবে মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের অতি নিকটে অবস্থান করে যদি চতুর্থ কিংবা তার বেশি মাত্রা (dimensions) এ থেকে আমাদের।দেখতে থাকেন কিন্তু আমরা তাকে দেখিনা।
আমরা ঘরের যত দরজা, জানালা লাগাই কিংবা পানি বা মাটির যতই গভীরে যাই না কেন আমরা ত্রিমাত্রিক (x,y,z) স্পেসকে ছাড়িয়ে যেতে পারব না ফলে আল্লাহ্ আমাদের এসব অবস্থায় দেখতে পান

দৃষ্টিসমূহ তাঁকে প্রতক্ষ করে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে আয়ত্ত করেন। তিনি অত্যন্ত সুক্ষদর্শী, সুবিজ্ঞ।(৬:১০৩)
লিখাটা pdf. ডাউনলোড করুন

https://imo.im/fd/B/3AjPyvslyO/why%20don%27t%20we%20see%20god1.pdf

____ আহমেদ শুভ